শ্রীশ্রী লক্ষ্মীদেবীর ব্রতকথা (পাঁচালী)
শ্রীশ্রী
লক্ষ্মীদেবীর ব্রতকথা (পাঁচালী)
নারায়ণং নমস্কৃত্য
নরঞ্চৈব নরোত্তমম্।
দেবীং সরস্বতীঞ্চৈব
ততো জয় মুদীরয়েৎ।।
বন্দে বিষ্ণুপ্রিয়াং
দেবীং দারিদ্র্য-দুঃখ-নাশিনীম্।
ক্ষীরোদ-পুত্রীং
কেশব-কান্তাং বিষ্ণোর্বক্ষঃ বিলাসিনীম্।।
দোল পূর্ণিমার
নিশি নির্মল গগন।
মৃদুমন্দ
প্রবাহিত মলয় পবন।।
লক্ষ্মীসহ
একাসনে বসি নারায়ণ।
কৌতুকে করিছে
নানাকথা আলাপন।।
হেনকালে বীণা
হাতে দেবর্ষি নারদ।
প্রণাম করিল
লক্ষ্মীনারায়ণ পদ।।
কি কারণ আজ
হেথা মাতা জিজ্ঞাসিলা।
নতশিরে মুনিবর
তবে নিবেদিলা।।
কহঃ মাতঃ!
এ কেমন মহিমা তোমার।
চঞ্চলা চপলা
সদা ভ্রম দ্বার দ্বার।।
মুহূর্ত্তের
তরে তব নাহি কোথা স্থিতি।
মর্ত্তবাসী
দিবানিশি ভুগিছে দুর্গতি।।
অন্নাভাবে
জীর্ণ জীব বলহীন দেহ।
অন্নের কারণে
করে আত্মহত্যা কেহ।।
অন্নের কারণে
নিজ পুত্রকন্যাগণে।
পরিত্যাগ
করি যায় কত শত জনে।।
বল দেবী!
বল বল কি পাপের ফলে।
দুর্ভিক্ষ
অনলে সদা মর্ত্তবাসী জ্বলে।।
বিষাদিতা
হ’য়ে মাতা অতি দুঃখ মনে।
মৃদুস্বরে
নারদেরে কহেন তখনে।।
মানবের সুখ
দুঃখ অথবা পতন।
দুষ্কৃতির
ফলমাত্র জানিবে কারণ।।
চঞ্চলা আমার নাম জগত জুড়িয়া।
কি কারণে
তাহা বলি শুন মন দিয়া।।
যবনের রীতি
নীতি করিয়া প্রবেশ।
আর্য্যভাব,
জাতিধর্ম্ম করিতেছে শেষ।।
শাস্ত্র নাহি
মানে দেখ যত নারী নর।
অশাস্ত্রকে
শাস্ত্রজ্ঞান করে নিরন্তর।।
যত অনাচার
আনি ভরিল সংসার।
অপবিত্র স্থানে
থাকা দুষ্কর আমার।।
গৃহকর্ম শিক্ষা
দীক্ষা দিয়া বিসর্জ্জন।
কুরুচি কুশিক্ষা
সবে করিছে অর্জ্জন।।
অনার্য্য
ভাবে বিভোর, সাজে বিবি প্রায়।
বসনে ভূষণে
মন সদা তাহা চায়।।
পরনিন্দা
পরচর্চা অতি ভালোবাসে।
মিলিয়ে সঙ্গিনী
সদা সেই সব ভাসে।।
পুরুষেরা
পরিহাসে উল্লাসিতা অতি।
পাপপূর্ণ
মন সদা নষ্টপথে মতি।।
দিবাভাগে
নিদ্রা যায়, ক্রোধ, অহংকার।
আলস্যে কলহে
পটু অনার্য্য ব্যাভার।।
তর্ক পেলে
পায় ঠেলে হিত উপদেশ।
ধরা করে সরাজ্ঞান
বাচালের শেষ।।
প্রদীপ না
দেয় তারা প্রতি সন্ধ্যাকালে।
উল্লাস বিলাসে
মত্ত, পমেটম গালে।।
সূর্য্যোদয়
হ’লে দেয় গোবরের ছড়া।
বাসি মুখে
থাকে নিজে বাসি বস্ত্র পরা।।
উচ্চ রব উচ্চ
হাসি যথেচ্ছা গমন।
সন্ধ্যাকালে
নিদ্রা আর নিশি জাগরণ।।
মতি গতি ভিন্ন
অতি অতিথি দেখিলে।
থাকুক সেবার
কার্য্য ক্রোধে উঠে জ্বলে।।
গুরুজন হিতবাক্যে
রুষ্ট হয় অতি।
বিদ্রূপ করেবা
কত তাঁহাদের প্রতি।।
হুলুধ্বনি
দিতে হ’লে মাথে পড়ে বাজ।
হাস্য ঠাট্টা
করে বলে অসভ্যের কাজ।।
স্বামীর আত্মীয়গণে
করে পরজ্ঞান।
গোপনে কু-যুক্তি
দেয় পৃথক কারণ।।
স্বীয় স্বার্থ
সিদ্ধি হেতু শুধু হাসি মুখে।
প্রসন্ন রাখিতে
চেষ্টা করেন স্বামীকে।।
পরিহাস পাত্র
হয় অক্ষম যখন।
তাচ্ছল্য
করয়ে বাক্য না করে শ্রবণ।।
মিথ্যা ছাড়া
সত্য কথা কভু নাহি কয়।
পরশ্রীকাতর
চিত্ত কুটিলতাময়।।
দেব দ্বিজে
ভক্তিহীন মতিচ্ছন্ন অতি।
আত্মস্বার্থে
সদা মত্ত যত কুলবতী।।
রসময় তৃপ্তি
হেতু অভক্ষ্য ভক্ষণ।
ফল তার নানা
ব্যাধি অকাল মরণ।।
যেই গৃহ এইরূপ
পাপের আগার।
অচলা হইয়া
তথা থাকি কি প্রকার।।
এই সব অনাচার
হেরি ঘরে ঘরে।
তাইত চঞ্চলা
হয়ে ফিরি দ্বারে দ্বারে।।
ঘুচিবে এসব
দোষ হলে সদাচারী।
ভক্তিডোরে
বাঁধা রহি দিবা বিভাবরী।।
ভক্তজনে বাঁধা
আমি ভক্তি না থাকিলে।
নাহি হয় কোন
ফল শুধু ফুলে জলে।।
ভক্তিই পরমাশক্তি
বাঁধিতে আমায়।
ভক্তিহীন
পূজা ব্রত সকলি বৃথায়।।
এত যদি কহিলেন
দেবী মুনিবরে।
পুনরায় জিজ্ঞাসেন
মুনি জোড়করে।।
কি হ’লে প্রসন্না
তুমি হও নর প্রতি।
কৃপা করি
কৃপাময়ী কহ তা সম্প্রতি।।
পারে কি লভিতে
নর তব পদ ছায়া।
ওগো দয়াময়ী
তুমি না করিলে দয়া।।
নারদের বাক্য
শুনি কহেন কমলা।
কি করিলে
প্রতি গৃহে থাকিব অচলা।।
সংক্ষেপে
জানাই তোমা সেই বিবরণ।
লক্ষ্মীযুক্ত
হবে নারী করি আচরণ।।
শুদ্ধ বস্ত্র
পরিধানে সিন্দূর কপালে।
গোবরের ছড়া
দেয় প্রতি প্রাতঃকালে।।
স্বামীর চরণ
নিত্যে সেবে যেই নারী।
যথার্থ বচন
কহে পরিহাস ছাড়ি।।
শ্বশুর শ্বাশুড়ী
আদি যত গুরুজনে।
সেবা করে
যত্নে, বাক্য পালেন যতনে।।
পতিব্রতা
রমণীর এই সুলক্ষণ।
সলজ্জ সতত
কহে সংক্ষেপে বচন।।
প্রতি গুরুবারে
যেবা লক্ষ্মীব্রত করে।
তার গৃহ নাহি
ছাড়ি তিলেকের তরে।।
ধনে জনে বাড়ে
ইথে নাহিক অন্যথা।
শাস্ত্রের
বচন মুনি জানিও সর্ব্বথা।।
যে গৃহে হয়
নিত্য অতিথি পূজন।
নারী পরিচর্য্যা
করে করিয়া যতন।।
যথা নাই হিংসা
দ্বেষ ক্রোধ অহংকার।
তথায় বসতি
হয় সতত আমার।।
শুদ্ধাচারে
না থাকিলে হয় বিপরীত।
অলক্ষ্মী
ঢুকিয়া করে সতত অহিত।।
শুনহ নারদ
আমি জানাই তোমায়।
সতী-নারী
যেই জন সেই মোরে পায়।।
মধুর বচনে
তুষি মাতা অতঃপর।
নারদ মুনিকে
দিল বিদায় তৎপর।।
নরলোক লক্ষ্মীছাড়া
দুঃখে জড়জড়।
প্রতিকার
চেষ্টা তার করিব সত্ত্বর।।
এতেক ভাবিয়া
দেবী নারায়ণ প্রতি।
কহিলেন প্রাণনাথ!
নরের দুর্গতি।।
কেমনে ঘুচাব
আমি দেও উপদেশ।
শুনিয়া রমার
বাণী কহে হৃষিকেশ।।
উতলা কি হেতু
শুন বচন আমার।
লক্ষ্মীব্রত
নরলোকে করহ প্রচার।।
গুরুবারে
সন্ধ্যাকালে মিলি বামাগণে।
পূজিয়া শুনিবে
কথা আনন্দিত মনে।।
ঘুচিবে দুর্গতি
তাহে তোমার কৃপায়।
প্রচুর সম্পদ
হবে বলিনু তোমায়।।
শ্রীহরি বচনে
দেবী হরষিত চিতে।
চলিলেন নরলোকে
পূজা প্রচারিতে।।
বিদর্ভ নগরে
আসি হ’ল উপনীত।
দেখিয়া শুনিয়া
দেশ হইল বিস্মিত।।
সে দেশের
রাজা হন নামে শ্রীসুমন্ত।
রূপবান গুণবান্
– ঐশ্বর্য অনন্ত।।
দেব দ্বিজে
ভক্তি সদা শস্য, স্বাস্থ্য, ধন।
অগণিতে শোভে
যথা কুবের ভবন।।
সাতপুত্র
নৃপতির সবে যুবজানি।
রূপে গুণে
সমযোগ্য না মিলে অবনী।।
এক অন্নে
সাতপুত্র রাখিয়া রাজন্।
সসম্মানে
লোকান্তরে করিল গমন।।
রাজপুত্র
বধুদের কুবুদ্ধি ঘটিল।
পরস্পর হিংসানলে
জ্বলিতে লাগিল।।
কুবুদ্ধি
চাপিল ঘাড়ে করিয়া যুকতি।
কুমন্ত্র
পতির কাণে ঢালিল যুবতী।।
সাত ভাই সাত
হাঁড়ি হইল তখন।
অলক্ষ্মীর
সহচর দিল দরশন।।
অনাহারে লক্ষ্মীদেবী
ছাড়িল সংসার।
সোনার সংসার
ক্রমে হল ছারখার।।
বৃদ্ধা রাণী
কহে হায়, সদা দুঃখে ভাসে।
তিষ্ঠিতে
না পারে আর বধূদের রোষে।।
অপমান জ্ঞানহীনা
হয়ে বৃদ্ধা রাণী।
নিবিড় কাননে
গেল ত্যাজিতে পরাণী।।
অন্নাভাবে
শীর্ণ দেহ মলিন বদন।
চলিতে অশক্ত
হ’য়ে করিছে ক্রন্দন।।
হেনকালে ছদ্মবেশে
দেবী নারায়ণী।
বন মধ্যে
উপস্থিত হইয়া আপনি।।
সদয় হৃদয়
দেবী জিজ্ঞাসে বৃদ্ধারে।
কি হেতু এসেছ
বৃদ্ধা এ ঘোর কান্তারে।।
কার কন্যা
হও তুমি কাহার গৃহিণী।
কি হেতু মলিন
মুখ কহ তাহা শুনি।।
মম সাধ্য
হলে কষ্ট ঘুচাব নিশ্চয়।
শুনি হরষিতা
বৃদ্ধা জোর হাতে কয়।।
বিদর্ভের
নরপতি শ্রীসুমন্ত নাম।
তাঁহার রমণী
আমি বিধি এবে বাম।।
গুণবান সাত
পুত্র রাখি নরপতি।
বৃদ্ধকালে
করিলেন লোকান্তর গতি।।
যতদিন ছিল
রাজা সদা গৃহে মোর।
লক্ষ্মী অধিষ্ঠিতা
ছিল, ঐশ্বর্য্য প্রচুর।।
পতির হইল
কাল, সুখ শান্তি যত।
গৃহ হ’তে
ক্রমে ক্রমে হ’ল তিরোহিত।।
সাতপুত্র
সাত হাঁড়ি হয়েছে এখন।
সতত বধূরা
মোরে করে জ্বালাতন।।
সহিতে না
পারি আর তাদের যন্ত্রণা।
ত্যাজিতে
জীবনা আজি করেছি কল্পনা।।
লক্ষ্মী বলে
শুন বৃদ্ধা আমার বচন।
আত্মহত্যা
মহাপাপ নরকে গমন।।
যাও সতী গৃহে
ফিরি কর লক্ষ্মীব্রত।
অচিরে হইবে
সুখ শান্তি পূর্ব্ব মত।।
গুরুবারে
সন্ধ্যাকালে মিলি বামাগণ।
করিবে লক্ষ্মীর
ব্রত হ’য়ে এক মন।।
জলপূর্ণ ঘটে
দিবে সিন্দূরের ফোঁটা।
আম্রের পল্লব
দিবে শিরে একগোটা।।
আসন সাজায়ে
তাতে দিয়া গুয়া পান।
সিন্দূর গুলিয়া
দিবে ব্রতের বিধান।।
ধূপ দীপ জ্বালাইয়া
রাখিবে ধারেতে।
শুনিতে বসিবে
কথা দুর্ব্বা লয়ে হাতে।।
একান্তে লক্ষ্মীর
মূর্ত্তি করিয়া চিন্তন।
একমনে ব্রতকথা
করিবে শ্রবণ।।
কথা শেষে
হুলুধ্বনি প্রণাম করিবে।
তারপর এয়োগণ
সিন্দূর লইবে।।
যে রমণী ব্রত
করে প্রতি গুরুবারে।
হইবে বিশুদ্ধ
চিত্ত সে আমার বরে।।
যেই গৃহে
ব্রতকালে সব বামাগণ।
অন্য অন্য
কাজ রাখি ব্রতে দেয় মন।।
সেই গৃহে
বাঁধা থাকি হইয়া অচলা।
ভক্তবাঞ্ছা
পূর্ণ করি আমি শ্রীকমলা।।
গুরুবারে
যদি হয় পূর্ণিমা উদিত।
উপবাসে যেই
নারী করে এই ব্রত।।
সকল অভীষ্ট
তার হইবে পূরণ।
পতি পুত্র
সহ সুখে রবে সর্ব্বক্ষণ।।
লক্ষ্মীর
ভাণ্ডার স্থাপি প্রতি ঘরে ঘরে।
রাখিবে তণ্ডুল
তাহে একমুষ্টি করে।।
সঞ্চয়ের পন্থা
ইহা জানিবে সকলে।
অসময়ে উপকার
পাবে তার ফলে।।
অলসতা ছাড়ি
সূতা কাট বামাগণ।
অন্নবস্ত্র
কষ্ট যাবে মহাত্মা বচন।।
আমি লক্ষ্মী
ইহা বলি নিজ মূর্ত্তি ধরি।
দরশন দিলা
দেবী স্বয়ং কৃপা করি।।
দেখিয়া হইল
বৃদ্ধা আনন্দে বিভোর।
প্রণাম করিল
সতী হাত করি যোড়।।
মম ব্রত কর
তুমি সংসারে প্রচার।
অচিরে হইবে
তব বৈভব অপার।।
পুত্র বধূগণ
বশে আসিবে আবার।
সুখ শান্তিময়
হবে তোমার সংসার।।
বর দান করি
দেবী হ’ল অদর্শন।
হরিষে বিষাদে
বৃদ্ধা গেল নিকেতন।।
গৃহেতে আসিয়া
সব করিল বর্ণন।
যেরূপে হইল
তাঁর দেবী দরশন।।
ব্রতের বিধান
সতী কহিল সবায়।
সবিশেষ কথা
দেবী কহিল তাঁহায়।।
বধূগণ মিলি
তবে করে লক্ষ্মীব্রত।
হিংসা দ্বেষ
স্বার্থভাব ঘুচিল ত্বরিত।।
কমলা করিল
তথা পুনঃ আগমন।
অচিরে হইল
গৃহ শান্তি নিকেতন।।
এইরূপে লক্ষ্মীব্রত
প্রতি ঘরে ঘরে।
ক্রমে প্রচারিত
হ’ল বিদর্ভ নগরে।।
দৈবযোগে একদিন
ব্রতকথা শুনি।
উপনীত হ’ল
আসি জনৈক রমণী।।
পতি তাঁর
অতি রুগ্ন অক্ষম অর্জ্জনে।
ভিক্ষা করি
যাহা পায় খায় দুইজনে।।
ব্রতের মানস
করি মনেতে কল্পনা।
নীরোগ পতিরে
কর করিল প্রার্থনা।।
ঘরে যেয়ে
এয়ো ল’য়ে করে লক্ষ্মীব্রত।
ভক্তিমতী
করে সতী পূজা বিধিমত।।
লক্ষ্মীর
কৃপায় তার দুঃখ হল দূর।
পতি হ’ল সুস্থ
দেহ সম্পদ প্রচুর।।
যথাকালে শুভ
লগ্নে হইল তনয়।
হইল সংসার
তার সুখের আলয়।।
অবশেষে শুন
এক অপূর্ব ব্যাপার।
ব্রতের মাহাত্ম্য
হ’ল যেভাবে প্রচার।।
বিদর্ভ নগরে
এক গৃহস্থ ভবনে।
নিয়োজিত নারীগণ
ব্রত আচরণে।।
শ্রীনগরবাসী
এক বণিক তনয়।
উপনীত হ’ল
আসি ব্রতের সময়।।
অতুল বিভব
তার ভাই পাঁচজন।
একে অন্যে
অনুগত সদা সর্ব্বক্ষণ।।
ব্রত দেখি
হেলা করি সাধুর তনয়।
বলে এ কি
ব্রত এতে কিবা ফল হয়।।
সদাগর বাক্য
শুনি বলে ব্রতিগণ।
করি মোরা
লক্ষ্মীব্রত দুর্ভাগ্য মোচন।।
ভক্তিযুক্ত
হ’য়ে যেবা এই ব্রত করে।
অতুল সম্পদ
হয় লক্ষ্মীদেবী বরে।।
এত শুনি সদাগর
অহংকারে বলে।
অকর্ম্মা
মেয়ের দল সংসার মজালে।।
ধনজন সুখভোগ
যা হয় এ ভবে।
সকলই শ্রমলভ্য
পূজিলে কি হবে।।
বসিয়া থাকিলে
যদি লক্ষ্মী দেয় ধন।
তখন বুঝিব
এই ব্রতটি কেমন।।
এমত বচন হেন
শুনিয়া তাহার।
অতিশয় রুষ্টা
দেবী হৈলা পরে তার।।
ধনমদে মত্ত
হয়ে লক্ষ্মী করি হেলা।
নানা দ্রব্যে
ভরি তরী বাণিজ্যেতে গেলা।।
হইল লক্ষ্মীর
কোপ সহ ধন জন।
সপ্ততরী সিন্ধুগর্ভে
হ’ল নিমগণ।।
গৃহদাহে সর্ব্বনাশ
হইল তাহার।
দিনান্তে
জুটেনা অন্ন সদা হাহাকার।।
ভা’য়ে ভা’য়ে
হ’ল ভেদ, ভিন্ন হয় অন্ন।
সোনার সংসার
এবে, সকলে বিপন্ন।।
জঠর যাতনা
আর সহিতে না পারি।
ভিক্ষা হেতু
পাঁচ ভাই হ’ল দেশান্তরি।।
বিবিধ বিপদে
পড়ি সাধুর নন্দন।
কান্দিয়া
কান্দিয়া করে নগর ভ্রমণ।।
এ দোষ আমার
বিধি নিদয় এমন।
অবোধ মানব
আমি অতি অভাজন।।
দয়াময়ী লক্ষ্মীদেবী
সকলি বুঝিল।
সাধুর দুর্গতি
দেখি দয়া উপজিল।।
নানাস্থানে
ঘুরাইয়া আনি তার পরে।
উপনীত করাইল
বিদর্ভ নগরে।।
দেখে তথা
ব্রত করে সেই ব্রতিগণ।
স্মরণ পড়িল
তার সব বিবরণ।।
বুঝিল তখন
কেন পড়িল বিপদে।
অহংকারী বলে
লক্ষ্মী না রাখিল পদে।।
যুক্ত করে
ভক্তি ভরে হ’য়ে এক মন।
স্তবস্তুতি
করে অতি সাধুর নন্দন।।
দাসের যতেক
দোষ ক্ষমা কর মাতঃ।
তব পদে মতি
যেন রহে অবিরত।।
ক্ষমা কর
ভগবতী ওগো ক্ষমাশীলে।
সত্যরূপা
হও তুমি এই মহীমণ্ডলে।।
পরমা প্রকৃতি
তুমি অজ্ঞান মানব।
অনন্ত মহিমা
রাশি কি বুঝিবে তব।।
পতিব্রতা
রমণীর তুমি মা উপমা।
ব্রহ্মা আদি
দেবগণ দিতে নারে সীমা।।
দেব নর সকলের
বিভবরূপিণী।
জগৎ-ঈশ্বরী
তুমি ঐশ্বর্য্য-দায়িনী।।
রাস-অধিষ্ঠাত্রী
দেবী তুমি রাসেশ্বরী।
তোমার স্বরূপা
হয় ভবে যত নারী।।
ত্রিদশ ঈশ্বরী
তুমি ত্রিদশ মণ্ডলে।
লক্ষ্মীরূপে
অধিষ্ঠিতা তুমি ভূমণ্ডলে।।
ক্ষীরোদ সাগরে
তুমি সাগর নন্দিনী।
গোলকধামেতে
তুমি মাধব মোহিনী।।
তুমিই তুলসী
গঙ্গা পতিত পাবনী।
সাবিত্রী
স্বরূপা তুমি বেদ প্রসবিনী।।
পদ্মাবতী
নামে তুমি ব্যক্ত পদ্মবনে।
কুন্দদন্তী
নাম ধর তুমি কুন্দবনে।।
তুমি মা সুশীলা
সতী কেতকী কাননে।
তুমিই কদম্বমালা
কদম্ব কাননে।।
রাজলক্ষ্মীরূপে
তুমি থাক রাজপুরে।
গৃহলক্ষ্মীরূপে
তুমি ব্যপ্ত চরাচরে।।
দরিদ্রকে
দিতে পার তুমি রাজপদ।
তোমার শ্রীপদ
ভবে অভয় সম্পদ্।।
দয়াময়ী, ক্ষমাময়ী
অধমতারিণী।
অপরাধ ক্ষমা
করি তরাও জননী।।
অন্নদে, বরদে
মাতঃ! বিপদনাশিনী।
দয়া কর দয়াময়ী,
তুমি নারায়ণী।।
এইরূপে স্তুতি
করি ভক্তিযুক্ত মনে।
একমনে সদাগর
ব্রতকথা শুনে।।
ব্রত সমাপন
শেষে করিয়া প্রণাম।
ব্রতের মানস
করি আসি নিজ ধাম।।
বধূগণ কহে
সাধু লক্ষ্মীব্রত সার।
সবে মিলি
কর ইহা প্রতি গুরুবার।।
শ্বাশুড়ী
বচন শুনি সব বধূগণ।
ভক্তিযুক্ত
মনে করে ব্রত আচরণ।।
ভক্তের অধীন
দেবী হইয়া সদয়।
সাধুর দুর্গতি
রাশি করিলেন ক্ষয়।।
দেবীর কৃপায়
বহু সম্পদ লভিল।
দরিদ্রতা
দূরে গেল বিপদ খণ্ডিল।।
উঠে ভাসি
সপ্ততরী সহ ধনজন।
বিস্ময়ে উল্লাসে
পূর্ণ সকলের মন।।
প্রত্যক্ষ
লক্ষ্মীর বাক্য দেখিয়া নয়নে।
ভক্তিভাবে
ভাবে সবে সদা সর্ব্বক্ষণে।।
হিংসা দ্বেষ
পরিহরি ভ্রাতা বধূগণ।
মিলিল সকলে
ছিল পূর্ব্বেতে যেমন।।
শান্তিপূর্ণ
নিকেতন হইল সাধুর।
দয়া ধর্ম্মে
রত সবে ঐশ্বর্য্য প্রচুর।।
শাস্ত্রের
বচনে এই লক্ষ্মীর চরিত্র।
পড়িলে শুনিলে
হবে পরম পবিত্র।।
নিষ্ঠার সহিত
গ্রন্থ যদি ঘরে রাখে।
লক্ষ্মী সহ
নারায়ণ সেই গৃহে থাকে।।
লক্ষ্মীব্রত
যে রমণী করে একমনে।
দিনে দিনে
বাড়ে সেই ধন পুত্র জনে।।
সতত শান্তিতে
থাকে দূরে যায় তাপ।
লক্ষ্মীব্রত
করিলে না থাকে দেহে পাপ।।
পতি পুত্র
হিতৈষিণী সতী যে রমণী।
স্বপ্নাদেশে
করে ব্রত সর্ব্বার্থদায়িনী।।
সতীর সাধনা
ধন এই লক্ষ্মীব্রত।
কালে কালে
প্রতিগৃহে হ’ল প্রচারিত।।
অতএব মতি
রাখি কমলার পদে।
বিধিমত কর
ব্রত তরিবে বিপদে।।
সতীর নিমিত্ত
ব্রত সদা তাঁর জয়।
অসতীর ধর্ম্মকর্ম্ম
বিফল নিশ্চয়।।
অসতীর কর্ম্ম
সব যায় রসাতল।
সতীর সতীত্ব
ধর্ম্মে সর্ব্বত্র মঙ্গল।।
সতী সাধ্বী
পতিব্রতা যত ব্রতিগণ।
প্রণাম করহ
কথা হ’ল সমাপন।।
নমস্তে করুণাময়ী
কলুষনাশিনী।
অগতির গতি
তুমি হও নারায়ণী।।
ক্ষীরোদ সম্ভবা
দেবী বিশ্ববিমোহিনী।
দয়াময়ী বিশ্বমাতা
জগৎজননী।।
স্বভক্ত বৎসলা
তুমি সত্যস্বরূপিণী।
হরিপ্রিয়া
পদ্মাসনা ভূতাপহারিণী।।
চঞ্চলা কমলা
তুমি ত্রিলোকপালিনী।
প্রণমামি
কৃপাময়ী মাধবমোহিনী।।
পদযুগে ভিক্ষা
মাগি কাতর অন্তরে।
লক্ষ্মীনারায়ণ
যেন বাঞ্ছা পূর্ণ করে।।
শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর
ধ্যান
ওঁ পাশাক্ষমালিকাম্ভোজ
সৃণির্ভির্যাম্যসৌম্যয়োঃ।
পদ্মাসনস্থাং
ধ্যায়েচ্চ শ্রিয়ং ত্রৈলোক্যমাতরং।।
গৌরবর্ণাং
সুরূপাঞ্চ সর্ব্বালংকারভূষিতাম্।
রৌক্মপদ্ম
ব্যগ্রকরাং বরদাং দক্ষিণেন তু।।
স্তব
ত্রৈলোক্য
পূজিত দেবী কমলে বিষ্ণু-বল্লভে।
যথা ত্বং
সুস্থিরা কৃষ্ণে তথা ভবময়ি স্থিরা।।
পুষ্পাঞ্জলী
দান মন্ত্র
নমস্তে সর্ব্বভূতাণাং
বরদাসি হরিপ্রয়ে।
যা গতিস্তৎ
প্রপন্নানাং সা মে ভূয়াত্ত্বদর্চ্চনাৎ।।
প্রণাম মন্ত্র
১। ধনাদায়ৈ
নমস্তুভ্যং নিধিপদ্ম হৃদায় চ।
পরস্তু ত্বৎ
প্রসাদান্মে ধনধান্যাদি সম্পদ।।
২। বন্দে
বিষ্ণুপ্রিয়াং দেবী দারিদ্র্য-দুঃখ-নাশিনীং।
ক্ষীরোদ সম্ভবা
দেবী বিষ্ণোর্বক্ষঃ বিলাসিনীং।।
৩। বিশ্বরূপস্য
ভার্য্যাসি পদ্মে পদ্মালয়ে শুভে।
সর্ব্বতঃ
পাহি মাং দেবী মহালক্ষ্মী নমোহস্তুতে।।
- শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর ব্রতকথা সমাপ্ত -

Comments
Post a Comment