জগদ্ধাত্রী পূজা - কীভাবে হল দেবী জগদ্ধাত্রীর পূজা প্রচলন? জানুন এই পোস্টে
বাঙালির ধর্মীয় মানসে রাজসিক দেবী দুর্গা (পার্বতী) ও তামসিক কালীর পরেই স্থান সত্ত্বগুণের দেবী জগদ্ধাত্রীর। উপনিষদে তিনি উমা হৈমবতী। তিনিই জগৎ পালিকা; সিংহবাহিনী চতুর্ভুজা।
দেবী জগদ্ধাত্রী ত্রিনয়না। তাঁর ডান হাতে চক্র ও বাণ, বাম হাতে শঙ্খ ও ধনুক। গলায় নাগযজ্ঞোপবীত।
বাহন সিংহ করীন্দ্রাসুর অর্থাৎ হস্তীরূপী অসুরের পিঠে দণ্ডায়মান। রক্তবস্ত্রপরিহিতা দেবীর গায়ের রঙ উদিয়মান সূর্যের মতো রক্তবর্ণা।
দুর্গাপূজার ঠিক একমাস পর কার্তিক শুক্লা নবমী তিথিতে দেবী জগদ্ধাত্রীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
দুর্গাকল্পে আছে - কার্তিকে শুক্লপক্ষেহনি ভৌমবারে জগৎপ্রসূঃ। সর্বদেবহিতার্থায় দুর্বৃত্তশমনায় চ।। আবিরাসীৎ জগচ্ছান্ত্যৈ যুগাদৌ পরমেশ্বরী।।
জগদ্ধাত্রী পূজার নিয়মটি একটু স্বতন্ত্র। দুটি প্রথা প্রচলিত, কোথাও সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত দুর্গাপূজার ধাঁচে জগদ্ধাত্রী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
আবার অনেকে নবমীর দিনই তিনবার পূজার আয়োজন করে সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী পূজা সম্পন্ন করেন। এই পূজার অনেক প্রথাই দুর্গাপূজার অনুরূপ।
কৃষ্ণনগর ও চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজা জগদ্বিখ্যাত। কিন্তু এই জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কি তা নিয়ে রয়েছে বহু মতান্তর।
বিভিন্ন তথ্য থেকে আনুমান করা যায় নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজত্বকাল থেকেই বাংলায় জগদ্ধাত্রী পূজার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।
পৌরাণিক উপাখ্যানে দেবী জগদ্ধাত্রী
উপাখ্যান অনুসারে অসুরদের বধের পর দেবতারা অহঙ্কারী হয়ে ওঠেন। তাঁরা ভুলেই যান যে নিজ শক্তিতে নয়, বরং ব্রহ্মের বলে বলীয়ান হয়েই তাদের এই বিজয়।
তখন দেবী লক্ষ্মী এক কুমারী বালিকার বেশ ধারণ করে দেবতাদের সামনে উপস্থিত হলেন। দেবতাদের অহং নাশের উদ্দেশ্যে দেবী তাঁদের সামনে একটি তৃণখণ্ড রাখলেন।
ইন্দ্র বজ্র দিয়ে সেই তৃণটি ধ্বংস করতে ব্যর্থ হলেন। অগ্নি সেই তৃণ দহন করতে পারলেন না, পবন তৃণটিকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে অসমর্থ হলেন।
দেবগণ ইন্দ্রকে বালিকার পরিচয় জানার জন্য পাঠালেন। জিজ্ঞাসু ইন্দ্রের সামনে আবির্ভূতা হলেন এক সালঙ্কারা চতুর্ভুজা স্ত্রী মূর্তি। পুরাণে তিনিই দেবী জগদ্ধাত্রী নামে পরিচিত।
কাত্যায়নী তন্ত্রে দেবী জগদ্ধাত্রী
কাত্যায়ণী তন্ত্রের ৭৬ অধ্যায়ে দেবী জগদ্ধাত্রীর আবির্ভাবের কাহিনি বর্ণনা করা আছে।
দেবগণের শক্তি সম্পর্কে ভ্রান্তি দূর করতে দেবী জগদ্ধাত্রী (পার্বতী) কোটি সূর্যের তেজ ও কোটি চন্দ্রের প্রভাযুক্ত এক দিব্য মূর্তিতে তাদের সম্মুখে উপস্থিত হলেন।
এর পরের কাহিনি কেন উপনিষদে বর্ণিত তৃণখণ্ডের কাহিনির অনুরূপ।
দেবগণ নিজেদের ভুল উপলব্ধি করলেন। তখন দেবী তাঁর তেজোরাশি স্তিমিত করে এই অনিন্দ্য মূর্তি ধারণ করলেন।
এই মূর্তি ত্রিনয়না, চতুর্ভুজা, রক্তাম্বরা, সালংকারা, নাগযজ্ঞোপবীতধারিনী ও দেব-ঋষিগণ কর্তৃক অভিবন্দিতা এক মঙ্গলময়ী মহাদেবীর মূর্তি।
সমগ্র জগৎকে পরিব্যাপ্ত করে দেবী দেবগণকে এই মূর্তি দেখালেন; দেবগণও তার স্তবে প্রবুদ্ধ হলেন।
করীন্দ্রাসুরের পরিচয়
দেবী জগদ্ধাত্রীর প্রতিমায় বাহন সিংহের পায়ের নীচে হাতির একটি মাথা থাকে। বিশ্বাস করা দেবীর পদতলে অবস্থিত মূর্তিটি করীন্দ্রাসুর অর্থাৎ মহাহস্তীরূপী অসুর।
সরাসরি করীন্দ্রাসুরের বর্ণনা না থাকলেও চণ্ডীতে উল্লেখ আছে, মহিষাসুর এক মস্ত হস্তী রূপে দেবীকে আক্রমণ করে।
এবং দেবী সেই হস্তীরূপী অসুরের মুণ্ডচ্ছেদ করেন। তখন সে এক পুরুষের বেশে অবতীর্ণ হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। মহালক্ষ্মী দেবী তাকে তির বিদ্ধ করেন।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, দেবী জগদ্ধাত্রী করীন্দ্রাসুর অর্থাৎ মহাহস্তীরূপী অসুরকে বধ করেছিলেন। এই কারণে দেবী জগদ্ধাত্রী করীন্দ্রাসুরনিসুদিনী নামে পরিচিত।
দেবী জগদ্ধাত্রী মূর্তিতে অস্ত্র হিসেবে তির ও ধনুকের উপস্থিতি জনমানসের এই বিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করে।
পূজা প্রচলন
চন্দননগর এবং কৃষ্ণনগর ব্যতীত জগদ্ধাত্রী পূজার উৎসব অকল্পনীয়। চন্দননগরের আলোকসজ্জা, দেবীমূর্তি ও শোভাযাত্রা বিশ্বখ্যাত।
যদিও জগদ্ধাত্রী পূজা প্রচলনের স্থান কাল নিয়ে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। রয়েছে নানান ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপট এবং লোকবিশ্বাস।
কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা করেন রাজা নদীয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়। অনেকে মনে কৃষ্ণচন্দ্রের প্রপৌত্র গিরিশচন্দ্র কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পূজার প্রবর্তন করেন।
কিংবদন্তি অনুসারে নবাব আলিবর্দির রাজত্বকালে রাজার বারো লক্ষ টাকা নজরানা দিতে অপারগ হলে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র মুর্শিদাবাদে (মতান্তরে মুঙ্গেরে) বন্দী হয়ে থাকেন।
মুক্তির পর রাজা যখন কৃষ্ণনগরে ফিরে আসেন, ততদিনে সেই বছর দুর্গাপূজার কাল উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছে। দুর্গাপূজার আয়োজন করতে না পেরে রাজা অত্যন্ত দুঃখিত হন।
সেই রাতে মাদুর্গা জগদ্ধাত্রীর রূপে রাজাকে পরবর্তী শুক্লানবমী তিথিতে জগদ্ধাত্রী পূজা করার আদেশ দেন। কৃষ্ণনগরে পালিত হয় জগদ্ধাত্রী পূজা।
যদিও জগদ্ধাত্রী পূজা প্রচলনের স্থান কাল নিয়ে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। অন্য এক মতে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা ১৭৬৬ সালে।
চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজার প্রবর্তক তর্কালঙ্কার শ্রীমান শুভেন্দু মাঝি।
শোনা যায়, জাতিস্মর শুভেন্দু মাঝি তাঁর তৃতীয় পূর্বজন্মে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, সাথে ছিলেন সরকারের দেওয়ান।
প্রায় আড়াইশো বছর আগে, কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পূজা দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি চন্দননগরের লক্ষ্মীগঞ্জ চাউলপট্টির নিচুপাটিতে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন করেন।
লক্ষ্মীগঞ্জ প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পরেই এই পূজার সূচনা। এই পূজা চন্দননগরে আদি পূজা নামে পরিচিত। চন্দননগর কেন্দ্রীয় জগদ্ধাত্রী পূজা কমিটির অনুমোদিত তিনশের অধিক পূজা হয়।
ধ্যানমন্ত্রে দেবীরূপ
ওঁ দূং সিংহস্কন্ধসমারূঢ়াং নানালঙ্কারভূষিতাম্। চতুর্ভূজাং মহাদেবীং নাগযজ্ঞোপবীতিনীম্।।
শঙ্খশার্ঙ্গসমাযুক্তাং-বামপাণিদ্বয়ান্বিতাং।
চক্রঞ্চ পঞ্চবাণাঞ্চ ধারয়েতঞ্চ দক্ষিণে।।
রক্তবস্ত্রপরিধানাং বালার্কসদৃশদ্যুতিম্। নারদাদ্যৈমুনিগণৈঃ সেবিতাং ভবসুন্দরীম্।।
ত্রিবলীবলয়োপেত-নাভিনালমৃণালিনীম্। ঈষৎসহাস্যবদনাং কাঞ্চনাভাং বরপ্রদাম্।।
নবযৌবনসম্পন্নাং পীনোন্নতপয়োধরাম্। করুণামৃতবর্ষিণ্যা পশ্যন্তীং সাধকং দৃশা।।
রত্নদ্বীপে মণিদ্বীপে সিংহাসনসমন্বিতে। প্রফুল্লকমলারূঢ়াং ধ্যায়েত্তাং ভবগেহিনীম্।।
বিচিন্তয়েৎ জগতাং ধাত্রীং ধৰ্ম্মকামার্থ মোক্ষদাম্।
ওঁ দূং শ্রীমৎজগদ্ধাত্রী দুর্গায়ৈ নমঃ।।

Comments
Post a Comment